নিজস্ব প্রতিবেদক : শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বেসরকারি হাসপাতালের দালালদের দৌরাত্ম্যে রোগীদের ভোগান্তি বেড়েছে। ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিড়ম্বনা এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। এছাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চত্বর জুড়ে যত্রতত্রভাবে পার্কিং করে রাখা হচ্ছে অসংখ্য ইজিবাইকসহ অন্যান্য যানবাহন। এতে জরুরিভাবে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। অপরদিকে হাসপাতালের বহির্বিভাগের ভেতরে অসংখ্য রিপ্রেজেন্টেটিভদের ভিড়। যদিও কাগজে-কলমে সপ্তাহে রবিবার ও বুধবার দুপুর ১২টার পর রিপ্রেজেন্টেটিভদের ডাক্তার ভিজিটের কথা, কিন্তু তারা এই নির্দেশের কোন তোয়াক্কা করেন না।
শ্রীনগর উপজেলায় বেশ কয়েকটি প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতাল রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি বেসরকারি হাসপাতাল ইয়াসমিন দেলোয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার মর্ডান হাসপাতাল ও ফেমাস জেনারেল হাসপাতাল। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ইয়াসমিন দেলোয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও মর্ডান হাসপাতালের ৬-৭ জন মহিলা ও পুরুষ দালাল নিয়োগপ্রাপ্ত থাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। তারা সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হাসপাতালের আউটডোরের প্রতিটি ডাক্তারের কক্ষের সামনে অবস্থান করে। এছাড়া জরুরি বিভাগ ও হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় ভর্তি রোগীদের ওয়ার্ডেও অবাধ বিচরণ তাদের। পাশাপাশি ফেমাস হাসপাতালের ৩-৪ জন নিয়োগকারী দালালরাও শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সবখানে একই কাজে ব্যস্ত থাকেন। এছাড়া বেসরকারি এই হাসপাতালগুলোর নিয়োগপ্রাপ্ত দালালেরা ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়া রোগীদের বিভিন্ন চমকপ্রদ লিফলেট দেখিয়ে রোগীদের তাদের হাসপাতালে বিভিন্ন পরিক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিপুল অর্থ খরচ করান। তাছাড়া সরকারি হাসপাতালে প্যাথলজি বিভাগ ও এক্সরে বিভাগ চালু থাকলেও সে সকল জায়গায় সরকার নির্ধারিত মূল্যে পরিক্ষা-নিরীক্ষা করা থেকে রোগীদের বঞ্চিত করেন।
এছাড়া শ্রীনগরে আরও কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল যেমন- সেবা জেনারেল হাসপাতাল, আমান ক্লিনিক, নিউ লাইফ জেনারেল হাসপাতাল ও পপুলার হাসপাতাল রয়েছে।
উল্লেখ্য, শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনে দেয়া পরিক্ষা-নিরীক্ষা রোগীরা ইয়াসমিন দেলোয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও মর্ডান হাসপাতাল এবং ফেমাস জেনারেল হাসপাতালে করালে মাস শেষে তাদের কাছে ৩০%-৬০% পর্যন্ত টাকা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ডাক্তারদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে উপঢৌকনও পাঠানো হয় তাদের মাধ্যমে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইয়াসমিন দেলোয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও মর্ডান হাসপাতাল এবং ফেমাস জেনারেল হাসপাতালে বিভিন্ন পরিক্ষার জন্য একজন হেমাটোলজিস্ট নিয়োগ থেকে পরিক্ষা করে স্বাক্ষরের মাধ্যমে রোগীদের হাতে দেয়ার কথা থাকলেও সেই হেমাটোলজিস্ট মাসে একদিনও আসেন না। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ একজন হেমাটোলজিস্টের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে আধাঘন্টা থেকে দেড় ঘন্টার মধ্যে রোগীর হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন সকল ধরনের রিপোর্ট। এছাড়া হরমোন পরিক্ষা, এইচআইভি, এইচবিএস এজিসহ গুরুত্বপূর্ণ পরিক্ষাগুলো কিটের মাধ্যমে চেক করে ১ ঘন্টায় রোগীর হাতে পৌঁছে দিচ্ছে হেমাটোলজিস্টের উপস্থিতি ছাড়া। তাছাড়া নিম্নমানের রি-এজেন্ট, অদক্ষ কর্মী দ্বারা স্যাম্পল কালেকশনসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এ ধরনের রিপোর্টের কারণে রোগীরা মিসট্রিটমেন্টের কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন।
তাছাড়া হাসপাতাল চত্বরে ও হাসপাতালের মূল গেটের সামনে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের লোক ঠকানো বিভিন্ন চমকপ্রদ বিজ্ঞাপনের সাইনবোর্ডও লক্ষ্য করার মতো।
রোগীরা অভিযোগ করে বলেন, শ্রীনগরের ষোলঘরে অবস্থিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শৃঙ্খলা বলতে কিছুই নেই এখন। পুরো হাসপাতালের চত্বর জুড়ে অসংখ্য ইজিবাইকের ছড়াছড়ি। চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণ রীতিমতো অটোরিকশার স্ট্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ডাক্তারদের চেম্বার ও আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিপ্রেজেন্টিটিভরা ডাক্তারদের ব্যবস্থাপত্র দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।
ভুক্তভোগী কয়েকজন নারী বলেন, রিপ্রেজেন্টেটিভদের উৎপাত অসহনীয়। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হতেই আকস্মিক ব্যবস্থাপত্র টেনে নিয়ে ছবি তুলছে। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এতে আমাদের গোপনীয়তা নষ্ট হচ্ছে।
শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ জসিম উদ্দিনের কাছে বেসরকারি হাসপাতালের দালালদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, বিষয়টি আমারও নজরে এসেছে। আমি উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। তাছাড়া এ বিষয়ে সরকারি নির্দেশনাও রয়েছে।
শ্রীনগরে বেসরকারি হাসপাতালের দালালদের দখলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ॥ অতিরিক্ত অর্থ খরচে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা
৩০