নিজস্ব প্রতিবেদক: মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার আড়িয়ল ইউনিয়ন পরিষদে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন লঙ্ঘন করে প্যানেল চেয়ারম্যান পরিবর্তনের অপচেষ্টা নিয়ে তীব্র অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় সরকার মুন্সীগঞ্জের উপ-পরিচালকের হস্তক্ষেপ চেয়ে গত ৫ জানুয়ারি লিখিত অভিযোগ করেছেন ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ড সদস্য ও ১নং প্যানেল চেয়ারম্যান জামাল হোসেন।
অভিযোগে বলা হয়, আড়িয়ল ইউনিয়নের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল কাদির হালদারের মৃত্যুর পর তার ছেলে দুলাল হালদার রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে উপনির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তবে নির্বাচনের পর থেকেই তিনি কার্যত ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্ব পালনে অনুপস্থিত ছিলেন।
লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, দুলাল হালদার পেশায় মেক্সিকো প্রবাসী ব্যবসায়ী এবং তার পরিবারসহ সেখানেই বসবাস করেন। বাবার মৃত্যুর পর দেশে এলেও, কোনো প্রকার সরকারি অনুমতি বা ছুটি ছাড়াই ৯ মার্চ ২০২৫ইং তারিখে দেশত্যাগ করে পুনরায় মেক্সিকো চলে যান। বিষয়টি সেসময় বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। চেয়ারম্যানের এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিকালে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে ১নং প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে জামাল হোসেন টানা প্রায় ৭ মাস দায়িত্ব পালন করেন।
তবে অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে তাকে কোনো আর্থিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি এবং চেয়ারম্যানের দায়িত্ব হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও কোনো আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রায় ৭ মাস পর গত ২৯ নভেম্বর দেশে ফিরে দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই দুলাল হালদার বিদ্যমান প্যানেল চেয়ারম্যান পরিবর্তনের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন, যা স্থানীয় সরকার আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ সনের ৬১নং আইনের সপ্তম অধ্যায়ের ৪ উপধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে- চেয়ারম্যান বা কোনো সদস্য তার স্বীয় পদ হতে অপসারণযোগ্য হবেন, যদি তিনি (ক) যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যতিরেকে পরিষদের পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকেন, (জ) বিনা অনুমতিতে দেশত্যাগ করেন অথবা অনুমতিক্রমে দেশত্যাগের পর সেখানে অননুমোদিতভাবে অবস্থান করেন।
অভিযোগকারীর দাবি, দুলাল হালদার উক্ত দুইটি বিধানই লঙ্ঘন করেছেন। তবুও আইনি বিষয়টি উপেক্ষা করে তিনি প্যানেল চেয়ারম্যান পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
অপরদিকে, স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ৩৩(৪) ধারা অনুযায়ী কোনো প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালনে অযোগ্য না হলে বা স্বেচ্ছায় দায়িত্ব পালনে অসম্মতি না জানালে নতুন প্যানেল গঠনের কোনো আইনগত সুযোগ নেই। অথচ জামাল হোসেন বর্তমানে দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ যোগ্য ও ইচ্ছুক থাকা সত্ত্বেও তাকে সরানোর অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান ও সদস্যগণের ছুটি সংক্রান্ত বিষয়ে এ আইনের ৪০-এ বলা হয়েছে কোন চেয়ারম্যান বা কোন সদস্যকে পরিষদ যুক্তিসঙ্গত কারণে ১ (এক) বৎসরে সর্বোচ্চ ৩ (তিন) মাস ছুটি মঞ্জুর করিতে পারিবেঃ তবে শর্ত থাকে যে, ৩ (তিন) মাসের অধিক ছুটি প্রয়োজন হইলে সরকারের অনুমোদন গ্রহণ করিতে হইবেঃ আরো শর্ত থাকে যে, নারী চেয়ারম্যান বা সদস্যের মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগের ক্ষেত্রে সরকারি বিধি-বিধান প্রযোজ্য হইবে।
এমতাবস্থায়, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া টানা ৭ মাস বিদেশে অবস্থান, আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আড়িয়ল ইউনিয়ন পরিষদের বিদ্যমান প্যানেল চেয়ারম্যান বহাল রাখার দাবি জানিয়ে মুন্সীগঞ্জের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালকের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, চেয়ারম্যান সাহেব ভেতরগতভাবে প্লানিং করে জামাল হোসেনকে প্যানেল চেয়ারম্যান থেকে বাদ দিতে চাচ্ছেন। তিনি প্রকাশ্যে আসছেন না। আগামী ১৯ তারিখে পরিষদে ভোটাভোটির মাধ্যমে নাকি প্যানেল চেয়ারম্যান নির্বাচন করা হবে। এটা অনৈতিক ও অনিয়ম।
এ বিষয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান মোঃ জামাল হোসেন বলেন, চেয়ারম্যান সাহেব প্যানেল ভেঙে নতুন প্যানেল করতে চাচ্ছে। এটা অনিয়ম। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই। আমি আমার ন্যায্য অধিকার ও দায়িত্ব পালন করতে চাই। আপনারা আমাকে সহযোগিতা করুন।
এ বিষয়ে আড়িয়ল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ দুলাল হাওলাদার বলেন, ম্যাজরিটি পার্সন মেম্বারগণ জামাল সাহেবকে অনাস্থা দিয়েছে। এখানে আমার কোনো হাত নেই। মেম্বারদের নিয়ে বিষয়টি জানার জন্য বসেছিলাম, তখনও ৭ জন মেম্বার অনাস্থা দিয়েছে তার উপস্থিতিতেই মৌখিকভাবে। এখানে অনিয়মের কিছু নেই। ম্যাজরিটি পার্সন সদস্যকে প্রাধান্য দিতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুরাইয়া মমতাজের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালকের মুঠোফোনে কল করা হলে কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, প্যানেল ভাঙার আইন রয়েছে। বর্তমান প্যানেল যদি অসমর্থ হয়, তাহলে সর্বসম্মতিক্রমে প্রসেসিংয়ে আগাতে হয়। মন চাইলেই ভাঙা যায় না। আগামী ১৯ তারিখ ভোটের মাধ্যমে প্যানেল ভেঙে নতুন প্যানেল হতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, আগে তো তাকে অসমর্থ প্রমাণ করতে হবে। স্যার মিটিংয়ে আছেন, আমি স্যারকে বিষয়টি জানাবো।