প্রকাশিত: ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০০ পিএম
1
মঙ্গলবার ২১, এপ্রিল ২০২৬ -- : -- --
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নে কোনো প্রকার নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে অসংখ্য অনুমোদনহীন হাউজিং কোম্পানি। সরকারি অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছাড়াই ফসলি জমি ও জলাশয় ভরাট করে এসব আবাসন প্রকল্প গড়ে ওঠায় হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশ।
সরেজমিনে বালুচর ইউনিয়নের চান্দেরচর পানিয়ার চরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দুই ডজনখানেকেরও বেশি হাউজিং কোম্পানি বিশাল বিশাল সাইনবোর্ড লাগিয়ে কৃষিজমি ভরাটের মহোৎসবে মেতেছে। এসব প্রকল্পের অধিকাংশেরই জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা রাজউকের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। হাউজিং কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ কৃষকদের জমি নামমাত্র মূল্যে লিখে নেওয়া কিংবা জোরপূর্বক বালু ভরাট করে দখলের অভিযোগও রয়েছে দীর্ঘদিনের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব কোম্পানি শুধু সাইনবোর্ড আর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করছে না, বরং তারা প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ ও খাল বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে বর্ষাকালে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে এবং কৃষি আবাদ ব্যাহত হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কৃষক বলেন, “আমাদের পৈতৃক ভিটা আর ফসলি জমি এখন হাউজিংয়ের পেটে যাচ্ছে। বাধা দিতে গেলে আমাদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে তারা রাতারাতি বালু ভরাট করে ফেলছে।”
পরিবেশবাদীরা বলছেন, এভাবে কৃষিজমি ও নিচু এলাকা ভরাট হতে থাকলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে খাদ্য সংকট দেখা দেবে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জলাশয় ভরাটের ফলে পানির স্তর নিচে নেমে গিয়ে সুপেয় পানির সংকটও তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি জানান, এই এলাকায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, হত্যার মতো একাধিক ঘটনা ঘটেছে এই হাউজিং কোম্পানিকে কেন্দ্র করে। বহু মামলা চলমান রয়েছে। এমনও ঘটনা আছে যে, দুই ভাই দুই হাউজিং কোম্পানির সাথে জড়িত। দ্বন্দ্বে জড়ালে দুই ভাই দুই পক্ষে টেঁটা-বল্লম নিয়ে যুদ্ধ করে বহু আহতের ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসন সঠিক তদারকি না করলে এ ধরনের সমস্যা দিন দিন বাড়তেই থাকবে।
এ বিষয়ে বালুচর ইউনিয়ন (ভূমি) কর্মকর্তা মোঃ মোক্তার হোসেন গাজী জানান, হাউজিং কোম্পানির মালিকদের সাথে কথা বললে তাদের হাউজিং কোম্পানির কাগজপত্র চাইলে তারা কোন তথ্য বা কাগজপত্র দেন না। আমার কাছে ১৩টি হাউজিং কোম্পানির তালিকা আছে। এর মধ্যে সঠিক কাগজপত্র আছে কি না তা আমার জানা নেই।
এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, আপনি হাউজিং কোম্পানির মালিকদের সাথে ফোনে কথা বলে তথ্য নিয়ে নেন।
এ বিষয়ে বালুচর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাপস দাসের সাথে কথা বললে তিনি সঠিক কোন তথ্য দিতে পারেননি।
সিরাজদিখান উপজেলা সহকারী কমিশনর (ভূমি) এর মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুম্পা ঘোষ জানান, “অনুমোদনহীন হাউজিং প্রকল্পের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান নিয়মিত চলমান রয়েছে। কোনো কোম্পানি যদি অবৈধভাবে জমি দখল বা নিয়ম বহির্ভূতভাবে বালু ভরাট করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধুমাত্র লোক দেখানো জরিমানা বা অভিযান যথেষ্ট নয়; বরং এই অবৈধ আবাসন ব্যবসা চিরতরে বন্ধ করতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় বালুচর ইউনিয়নের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে।