প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম
100
বৃহস্পতিবার ০৫, নভেম্বর ২০২৬ -- : -- --
স্বপ্না আক্তার রাকা : গ্রামের মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে কাছের ঠিকানা কমিউনিটি ক্লিনিক। ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করা এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, মা ও শিশুর সেবা, টিকা আর পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দেওয়া। সরকারি মানদন্ড ছিল প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি ক্লিনিক।
দেশের চিত্র
২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নীতিগত পরিবর্তনে ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ২০০৯ সালের পর আবার চালু হয়। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৪ হাজার ৪২৫টি ক্লিনিক নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৩৬৩টি চালু আছে। ২০১৮ সালের আইনে ক্লিনিকগুলো এখন আলাদা ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবু সমস্যা কাটেনি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ওষুধ সরবরাহ বন্ধ ছিল। ২০২৬ সালেও অপারেশনাল প্ল্যান পরিবর্তনের জটিলতায় সরবরাহ অনিয়মিত হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় রোগীরা ওষুধ না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
মুন্সীগঞ্জের বাস্তবতা
সরকারি মানদন্ড অনুযায়ী মুন্সীগঞ্জের ১০৯টি ক্লিনিক হাজার হাজার মানুষের প্রথম ভরসা হওয়ার কথা। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় ১৪৬ জন স্বাস্থ্য সহকারী, ১১৭ জন পরিবার কল্যাণ সহকারী ও ২১৭ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার সিএইচসিপি কর্মরত। কাগজে এই সংখ্যা আশ্বাস দেয়। কিন্তু মাঠে একজন সিএইচসিপিকে অনেক সময় একাধিক ক্লিনিকের দায়িত্ব সামলাতে হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে ক্লিনিক খোলা থাকবে কি না, তা অনিশ্চিত থেকে যায়।
ওষুধের সংকট এখানেও বড় সমস্যা। যে ক্লিনিক থেকে বিনামূল্যে জ্বর, ডায়রিয়া বা সর্দি-কাশির সাধারণ ওষুধ পাওয়ার কথা, সেখান থেকে রোগী ফিরে যান প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে। তখন তাকে ফার্মেসিতে যেতে হয়। যার আয় কম, তার জন্য এই বাড়তি খরচ বড় বোঝা।
নদীবেষ্টিত মুন্সীগঞ্জের চরাঞ্চলে সমস্যা আরও জটিল। বর্ষায় যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ না থাকলে টিকা সংরক্ষণের ফ্রিজ অকেজো থাকে, আর তাতে শিশুদের টিকাদান ব্যাহত হয়।
টংগিবাড়ী দিঘীরপাড় ইউনিয়নের চর বেহেরপাড়া ক্লিনিকটি স্থাপনের প্রায় পাঁচ বছর পর চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সময়টা ভবন পড়ে ছিল, সেবা ছিল না।
ভরসা হারালে ক্ষতি কার?
ক্লিনিকে আস্থা কমলে মানুষ ঝুঁকে পড়ে ফার্মেসি আর বেসরকারি চিকিৎসার দিকে। এতে খরচ বাড়ে, আর অপচিকিৎসার ঝুঁকিও বাড়ে। গর্ভবতী মায়ের নিয়মিত চেকআপ, শিশুর টিকা ও পুষ্টি পরামর্শের মতো সেবা যে প্রথম ধাপেই থেমে যায়, তার ক্ষতি ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে ভোগ করতে হয়।
করণীয়
শূন্য পদে দ্রুত সিএইচসিপি নিয়োগ দিতে হবে। একজনের ওপর একাধিক ক্লিনিকের চাপ কমাতে হবে এবং তাদের চাকরির নিরাপত্তা ও ন্যায্য বেতন-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ওষুধ সরবরাহ নিয়মিত করতে হবে। ট্রাস্টের মাধ্যমে ওষুধ যেন সময়মতো প্রতিটি ক্লিনিকে পৌঁছায়, তার তদারকি দরকার। জবাবদিহি বাড়াতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা নিয়মিত ক্লিনিক পরিদর্শন করবেন। সিভিল সার্জন কার্যালয় একটি পাবলিক ড্যাশবোর্ড চালু করতে পারে, যেখানে কোন ক্লিনিক কত দিন খোলা ছিল এবং ওষুধ আছে কি না, তা সবাই দেখতে পাবেন। স্থানীয় কমিউনিটি গ্রুপকে সক্রিয় করতে হবে। যিনি ক্লিনিকের জমি দিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি ও শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত এই গ্রুপই পারে ক্লিনিককে নজরে রাখতে। নতুন ভবন গড়ার চেয়ে এখন জরুরি আছে যেগুলো, সেগুলোকে সচল রাখা। ভবন থাকলেই ক্লিনিক হয় না। সেবাদাতা, ওষুধ আর খোলা দরজা থাকলেই তবে সেটা প্রকৃত অর্থে “ভরসার ঘর”।